এম. এ. মান্নান আমাদের অহংকার ও গর্বের প্রতীক

প্রকাশিত: ১০:৩৪ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২১

এম. এ. মান্নান আমাদের অহংকার ও গর্বের প্রতীক

সমীর কান্তি পুরকায়স্থ :- বিগত কয়েকদিন পূর্বে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী মহোদয়ের মোবাইল ফোন ছিনতাই নিয়ে হাটে-মাঠে-ঘাটে সর্বত্রই হট-টকে পরিণত হয়েছিল। সম্মানিত এক কলামিস্ট মন্ত্রী মহোদয়ের মোবাইল ফোন ছিনতাই নিয়ে একটি কলাম লিখেছেন। আমি তার সম্পূর্ণ লেখাটি পড়েছি। তাঁর লেখার কিছু কিছু কথাতে আমিও একমত পোষন করছি। যেমন নিরাপত্তা কর্মী মন্ত্রী মহোদয়ের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা কর্মী যদি সর্বদা সজাগ থাকতো তাহলে এ ধরণের ঘটনা ঘটতনা। ছিনতাই এর ঘটনা নিয়ে একটিু তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে আসবে সবকিছু। রাষ্ট্র পরিচালনা তিনি আমলাদের দৌরাত্যের কথাও তুলে ধরেছেন। এ কথা সত্য যে বিগত সরকারগুলোর আমলে থেকে এখন পর্যন্ত আমলাদের দাপট কিছু মাত্রেই কমেনি। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে আমলাদের বার বার নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন যে তারা হলেন জনগণের সেবক এটা ভেবে যেন তারা কাজ করেন।
এখন মূল প্রসঙ্গেই আসি। লেখক তার ঐ লেখাতে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী এম.এ মান্নানের পূর্বেকার পেশাগত জীবন ও বর্তমান রাজনৈতিক জীবন নিয়ে যে তীর ছোড়া সম বক্তব্য তুলে ধরেছেন তার সাথে আমি একমত হতে পারিনি। ভাটি বাংলার কৃষক পরিবার থেকে আসা এম.এ মান্নান ১৯৭০ সালে ঈ.ঝ.চ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সারা পাকিস্তানের ১৩ তম স্থান এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) ১ম স্থান অধিকার করেন। চাকুরীতে যোগদানের চিঠি আসে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। প্রথমে চাকুরীতে যোগদানের ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত চাকুরীতে যোগ দেননি। তিনি ভাবলেন পাক-সরকারের লেলিয়ে দেওয়া বর্বর পাক-বাহিনী আমাদের মানুষকে যে ভাবে হত্যা করছে, মা-বোনদের ইজ্জত কেড়ে নিচ্ছে সেই সরকারের অধীনে আর চাকুরী করা যায় না। তিনি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে মুক্তিকামী-জনতার পাশে ছুটে এলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়াটাই তাঁর কাছে সেদিন বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল চাকুরী করাটা নয়। তারপর দেশ স্বাধীন হল। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর এম.এ. মান্নান বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে চাকুরীতে যোগদান সংক্রান্ত চিঠির বিষয় বস্তু তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধু সব কিছু শুনে তৎক্ষনাও তাঁকে চাকুরীতে বহাল করতে নির্দেশ দেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তার চাকুরীতে যোগদানের দেরী হয়ে যায় এবং পরে ১৯৭৪ সালে তিনি চাকুরীতে যোগদেন। তারপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রন্ত বিপথগামী কিছু সেনা সদস্য কর্তৃক বঙ্গবন্ধু সপরিবারের নিহত হলে খন্দকার মোস্তাক নব নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। খুনী মোস্তাকের পরে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন জিয়াউর রহমান তারপর আসেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তাঁরা কেহই সাংবিধানিক ভাবে আসেন নি। লেখক তার লেখায় লিখেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃবন্দের উপর যখন নির্যাতন নিপীড়র চলছিল সেই সময় এম.এ মান্নান অসংবিধানিক সরকারের একান্ত অনুগত থেকে নানা পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তরতর করে আকর্ষণীয় পদগুলোতে উন্নীত হয়েছেন। এ কথাগুলো বলে তিনি কী বুঝাতে চেয়েছেন তা তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন নি। তবে তার এ কথাগুলোর অন্তানিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষন করলে যা পাওয়া যায় তা হল আওয়ামীলীগের দুঃসময়ে অসাংবিধানিক সরকারের মনতুষ্টি করে চাকুরী ক্ষেত্রে নিজের সুবিধাগুলো তিনি আদায় করে নিয়েছেন। তবে তার এ ধারণা ঠিক নয়। কেননা পেশাগত জীবনে সরকার বা কর্তৃপক্ষের অনুগত থেকেই নিজের উপর অর্পিত দায়-দায়িত্বগুলো সম্পন্ন করতে হয় উহা চাকুরী বিধি-বিধানের অন্তর্ভূক্ত। এ ক্ষেত্রে তিনি চাকুরী বিধি-বিধানের নিয়মই পালন করেছেন অন্য কিছু নয়। তাঁর পেশাগত জীবন বিশ্লেষণ করলে আমরা যা পাই তা হলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি কর্তব্যে নিষ্ঠা থেকে সততার সহিত তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্বগুলো তিনি সফলতার সহিত করে গিয়েছেন যাতে জনগন উপকৃত হয়। পেশাগত জীবনে দায়িত্ব নিয়ে তিনি যেখানে গিয়েছেন সেখানেই সমাদূত হয়েছেন। জনবাদ্ধব একজন প্রশাসক হতে পেরেছিলেন বলেই পেশাগত জীবনে তাঁর পদোন্নতিতে বাধা পড়েনি যা লেখকের মতে কারো কৃপাদৃষ্টিতে তরতর করে হয়েছে বলেই মনে হয়েছে। চাকুরী শেষে অবসর জীবনে তাঁর রাজনীতিতে আসা প্রসঙ্গে তিনি যা লিখেছেন তা হল ২০০১ সারে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর যে দুঃশাসন চালিয়েছিল তা থেকে সহজেই বুঝা গিয়েছিলেন যে ২০০৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে চারদলীয় জোট আর ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এটা ভেবেই নাকি তিনি অবসর জীবনে ২০০৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন । তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে এম.পি হন। ২০১৪ সালে প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৯ সালে পূর্নমন্ত্রী হন। পোশাগত জীবনে পদোন্নতির মতই নাকি তার অবসর জীবনের রাজনীতিতেও পদোন্নতি অব্যাহত থাকে। আমার মতে লেখকের এ ধারণা সম্পূর্ণ বা গল্পনিক বানোয়াট এবং উদ্দেশ্য প্রনোদিত। কেননা ৮০’র দশকের শেষ দিকে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমলেই তিনি চাকুরী ছেড়ে দিয়ে রাজনীতিতে আসতে চেয়েছিলেন। এম. এ মান্নান তখন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তখনকার সময় বিরোধী দলীয় নেত্রী। সে সময় তিনি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে গিয়েছিলেন এক রাজনৈতিক সভায়। ফেরার পথে রাতে ময়মনসিংহ জেলা সদরে সার্কিট হাউসে তিনি অবস্থান নেন। পুলিশ সুপার ছুটিতে থাকায় তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে নিয়ে সর্বোচ্চ প্রটোকলের ব্যবস্থা নেন। পরের দিন সকালে নাস্তা খাওয়ার সময় এক আলাপ চারিতায় এম.এ মান্নান জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন তিনি চাকুরী ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে তাঁর নেতৃত্বে কাজ করতে চান। জননেত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন “চাকুরীর ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। অভিজ্ঞতা আরও অর্জন করুন। এই দিন আর থাকতে না। একদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে। তখন আমি আপনাকে খুঁজে নেব।” সুতরাং জননেত্রীর সঙ্গেঁ তার এই আলাপ চরিতা থেকে যা বুঝা যায় তা হল পূর্বথেকেই তার রাজনীতিতে যোগদানের প্রস্তুতি ছিল তা চারদলীয় জোট সরকারের পতনের সম্ভাবনা দেখে নয়। তাঁর এই রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিশেষ যে কারণটি ছিল তা হল ৬০ এর দশকে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ৬ দফা কর্মসূচী তার হৃদয়েকে এমনভাবে স্পর্শ করেছিল যে তখন থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর একজন ভক্ত হয়ে যান। তারপর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চাকুরীতে তাঁর যোগদানের বিষয়টাও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই হয়। এতে করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ ও কৃতজ্ঞতা বোধ এমন এক পর্যায়ে পৌছেছিল যে সরকারী উচ্চপদে থাকা স্বত্বেও তার মনে প্রশান্তি ছিল না। তাই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও লক্ষ্যকে হৃদয়ে ধারণ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের তিনি আস্থা রেখে তিনি রাজনীতিতে এসে বঙ্গবন্ধু হত্যার সুবিচার সহ জনগনকে একটি গনতান্ত্রিক সরকার উপহার দেওয়া এ যেন তাঁর কাছে এক নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে হয়েছিল। জানিনা লেখক কেন মন্ত্রী মহোদয়ের পেশাগত ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ে সম্পূর্ন কাল্পনিক এবং বানোয়াট তথ্য পরিবেশন করে তাঁর ভাবমূর্তিতে আঘাত আনার অপচেষ্ঠায় লিপ্ত হয়েছেন। আমার মতে একজন আদর্শবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপর এ ধরণের কাল্পনিক তথ্য উপস্থাপনর করে পাঠক সমাজে তুলে ধরা সুস্থ মন মানসিকতার পরিচয় বহন করে না। পরিশেষে বলতে চাই এম. এ মান্নান আমাদের ভাটি বাংলার অহংকার ও গর্বের প্রতীক এবং আশা ভরসার স্থলও বটে।


লেখক :- সমীর কান্তি পুরকায়স্থ
সহকারী প্রধান শিক্ষক (অবঃ)
দি এইডেড হাইস্কুল, সিলেট।



এ সংবাদটি 42 বার পড়া হয়েছে.
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •   
  •   
  •   
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

সর্বশেষ শিরোনাম